বাবা, এবার গরু কিনবে না?” – সাত বছরের ছেলে আরিবের প্রশ্নটা বুকে তীরের মতো বিঁধলো মতিঝিলের ব্যাংকার আরিফুল ইসলামের।
বেতন ৪৫ হাজার। বাসা ভাড়া ১৮, ছেলের স্কুল ১২, বাকিটা বাজার-সংসারে হাওয়া। ঈদ বোনাস মিলিয়ে হাতে ১ লাখ টাকা। ঢাকায় এই টাকায় কোরবানি বিলাসিতা। কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কলিজাটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
আরিব আবার জিজ্ঞেস করে, “বাবা, গতবারও তো কিনো নাই। আমার বন্ধুরা সবাই গরু কিনছে।”
আরিফুল ছেলেকে বুকে টেনে নেন। চোখের পানি লুকিয়ে বলেন, “আব্বা, আমরা এবার দাদু বাড়ি যাবো। গ্রামে গিয়ে দাদুর সাথে গরুর হাটে যাবো। দাদুর জন্য সবচেয়ে সুন্দর গরুটা আমরাই কিনবো, কেমন?”
ছোট্ট আরিবের চোখ চকচক করে ওঠে। “সত্যি বাবা? আমি নিজে দাদুর গরু পছন্দ করবো? তারপর দাদু বাড়ির উঠানে গরু বাঁধবো? পাড়ার সবাই দেখতে আসবে?”
“হ্যাঁ বাপ, সবাই দেখতে আসবে। তোর দাদু, চাচারা, পাশের বাড়ির রহিম চাচা, বিধবা জমিলা চাচি – সবাই। আমরা যে গরু কিনবো, তার গোশত দিয়া পুরা গ্রামের মানুষ একবেলা পেট ভরে খাবে। এইটাই তো আসল কোরবানি, আব্বা।”
*এখনো গরু কেনেন নাই আরিফুল।* বাজেট ১ লাখ টাকা। আগামী শুক্রবার ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় যাবেন। সেখানকার হাট থেকে গরু কিনবেন।
“ঢাকায় কোরবানি দিলে ফ্রিজ ভরবে। কিন্তু গ্রামে দিলে ৩০টা ঘরের চুলা জ্বলবে। আব্বা গতবার ফোনে কাঁদতে কাঁদতে কইছিল, ‘বাপ, পাড়ার এতিম পোলাপানগুলা আমার দরজায় আইসা খালি হাতে ফিরা গেছে’। এইবার আর সেই কান্না শুনতে চাই না,” বলেন আরিফুল।
গরিবের হক, আত্মীয়ের হক
গ্রামে কোরবানি দেওয়ার আসল মানেটা বোঝেন আরিফুল। শহরের চার দেয়ালের ভেতর কোরবানি দিলে মাংস তিন ভাগের দুই ভাগ নিজের ফ্রিজেই থাকে। আত্মীয় বলতে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ, প্রতিবেশী বলতে দারোয়ান।
কিন্তু গ্রামে? দাদুর উঠানে গরু জবাই হলে পাড়ার রিকশাওয়ালা, ভ্যানচালক, বিধবা চাচি, এতিম ভাতিজা – সবার ঘরে গোশত যায়। যাদের সারা বছর গোশতের স্বাদ জোটে না, ঈদের দিন তারা পেট পুরে খায়। দাদু নিজ হাতে ভাগ করে দেন। এটাই ইসলামের শিক্ষা, এটাই কোরবানির হক আদায়।
“আমার আব্বা বলে, ‘বাজান, কোরবানি কবুল হয় গরিবের দোয়ায়। তোর দেওয়া গোশত খাইয়া রহিম চাচা যখন দুই হাত তুইলা দোয়া করে, ঐ দোয়া আসমানে আটকায় না’,” – বলেন আরিফুল।
মধ্যবিত্তের হিসাব, বাবার দায়িত্ব
গুলশানের আইটি ফার্মে চাকরি করা সুমাইয়া আক্তারও একই পথের পথিক। “মেয়েটা নতুন জামার বায়না ধরছিল। পারি নাই দিতে। কিন্তু ওরে বুঝাইছি – ‘আম্মু, আমরা গ্রামে নানুর জন্য কোরবানি দিবো। নানু বাড়ির সবাই তোমার নামে দোয়া করবে’। মেয়েটা এখন নিজেই বলে, ‘মা, নানুর গরুটা যেন বড় হয়’।”
কারওয়ান বাজারের খামারি শহীদুল বলেন, “ভাই, এবার কাস্টমার আইসা প্রথমেই জিগায় – ‘ভাই, ১ লাখে ৪ মণ গোশত হবে এমন গরু দেন’। তারা নিজের জন্য ভাবে না। ভাবে গ্রামে কয়টা ভাগ হবে, কয়জন মানুষ খাইতে পারবে।”
*শেষ কথা: বাবার চোখের পানি vs সন্তানের হাসি*
আরিফুল ব্যাগ গুছাচ্ছেন। কাল ভোরে ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাস ধরবেন। আরিবের খুশি আর ধরে না – “বাবা, আমি লাল গরু কিনবো। দাদু লাল গরু পছন্দ করে।”
আরিফুল জানেন, ঢাকায় থেকে গেলে ছেলেটা হয়তো বন্ধুদের গরু দেখে মন খারাপ করতো। কিন্তু দাদু বাড়ির হাটে গিয়ে যখন নিজ হাতে গরুর দড়ি ধরবে, যখন পাড়ার সব বাচ্চা ওকে ঘিরে ধরবে, যখন দাদু ওর কপালে চুমু দিয়ে বলবে ‘আমার দাদুভাই গরু কিনা আনছে’ – সেই হাসির দাম ১ লাখ টাকা না, কোটি টাকাও না।
এটাই মধ্যবিত্ত বাবার কোরবানি। নিজের শখ, সন্তানের আবদার, শহরের চাকচিক্য – সব কুরবান করে দিয়ে গ্রামের মাটিতে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, গরিবের হক আদায় করা।
কারণ তারা জানে, ঢাকার ফ্রিজে না, গরিবের দোয়াতেই কোরবানি কবুল হয়।
বি.দ্র: স্থান ও নাম ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে_
| ফজর | ৫.৩০ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১.৩০ মিনিট দুপুর |
| আছর | ৪ টা বিকাল |
| মাগরিব | ৬ টা সন্ধ্যা |
| এশা | ৭.৩০ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১.৪০ মিনিট দুপুর |